হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, হযরত আয়াতুল্লাহ জাওয়াদি আমোলির সাপ্তাহিক নৈতিক শিক্ষা সভা আজ বুধবার কোমের মসজিদে আ‘যমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয়।
হযরত আয়াতুল্লাহ জাওয়াদি আমোলি এ সভায় নাহজুল বালাগায় বর্ণিত আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)-এর কয়েকটি সংক্ষিপ্ত বাণী উল্লেখ করে তাওহীদের প্রকৃত তাৎপর্য এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে এর প্রভাব ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, মুয়াহহিদ বা তাওহীদবাদী মানুষ সে-ই, যার জীবনের সকল কাজ ও আচরণে তাওহীদের প্রভাব প্রকাশ পায়।
তিনি প্রথমে নাহজুল বালাগার কাঠামোর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, আমিরুল মুমিনিন (আ.)-এর নূরানি বাণীগুলো নাহজুল বালাগায় খুতবা, পত্র, উপদেশ ও সংক্ষিপ্ত বাণীর আকারে সংকলিত হয়েছে। এসব সংক্ষিপ্ত বাণীর কিছু অংশ মূল খুতবা ও পত্রের মধ্যেও রয়েছে। তবে সাইয়্যিদ রাযি (রহ.) কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোনো খুতবা বা পত্রের এমন অংশ, যাতে হযরত আলী (আ.)-এর অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও বাগ্মীতাপূর্ণ বক্তব্য ছিল, তা আলাদাভাবে নির্বাচন করে সংক্ষিপ্ত বাণীর অংশে সংকলন করেছেন।
তিনি আরও বলেন, এসব নূরানি বাণীর কিছু অংশ অন্যান্য পত্র ও গ্রন্থেও বর্ণিত হয়েছে। আবার নাহজুল বালাগায় যেসব বক্তব্য সংকলিত হয়নি, সেগুলোর কিছু অংশ তামামু নাহজুল বালাগা নামক মূল্যবান গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। এই গ্রন্থের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সংকলক এ ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিশ্রম করেছেন।
তাওহীদ জান্নাতের মূল্য
আয়াতুল্লাহ জাওয়াদি আমোলি বলেন, হাদিসে এসেছে: «التوحید ثمن الجنة»-“তাওহীদ জান্নাতের মূল্য।” তাওহীদবাদী না হয়ে কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে না। জান্নাত হলো তাওহীদবাদীদের আবাস এবং জান্নাতের বিভিন্ন মর্যাদাও মানুষের গুণাবলি, বিশ্বাস ও নৈতিকতার ওপর নির্ভরশীল।
তিনি বলেন, মুয়াহহিদ সেই ব্যক্তি নন, যিনি শুধু বিশ্বাসের পর্যায়ে আল্লাহকে এক বলে স্বীকার করেন; বরং মুয়াহহিদ হলেন তিনি, যার কর্ম ও আচরণে তাওহীদের প্রভাব রয়েছে, যিনি সৃষ্টিকর্তাকে বাদ দিয়ে জগতকে দেখেন না এবং নিজের জীবনের প্রতিটি দিককে «لا حول و لا قوة إلا بالله»-“আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই”-এর ছায়ায় উপলব্ধি করেন।
তিনি আরও বলেন, ইমামত ও উম্মতের ব্যবস্থায় ইমামের জীবন তাওহীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আমরা যখন জিয়ারত ও দোয়ায় ইমামগণের (আ.) দরবারে উপস্থিত হয়ে তাঁদের জীবনের প্রতিটি অবস্থা ও দিকের জন্য সালাম নিবেদন করি, সেটিই প্রমাণ করে যে একজন তাওহীদবাদী মানুষের জীবনের সকল প্রভাব ও দিক তাওহীদনির্ভর।
জ্ঞানকে আমলের মাধ্যমে জীবন্ত রাখুন; আমলহীন জ্ঞান অজ্ঞতারই নাম
বক্তব্যের অন্য অংশে জ্ঞানের ওপর আমল করার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে হাওযার শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা জ্ঞানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আপনারা পড়াশোনা, গবেষণা, গ্রন্থ রচনা, পাঠদান ও বক্তৃতার কাজ করেন। কোনো পিতা যদি তাঁর সন্তানের কাছে কোনো সম্পদ আমানত হিসেবে দিয়ে যেতে চান, তাহলে তিনি বলেন-এই সম্পদ নষ্ট করো না। আমিরুল মুমিনিন (আ.)-এর সবার প্রতি, বিশেষ করে হাওযার শিক্ষার্থীদের প্রতি উপদেশ হলো-এই জ্ঞানরূপ সম্পদ নষ্ট করো না।
তিনি আমিরুল মুমিনিন (আ.)-এর বাণী উদ্ধৃত করে বলেন:
«لَا تَجْعَلُوا عِلْمَکُمْ جَهْلًا، وَ یَقِینَکُمْ شَکّاً؛ إِذَا عَلِمْتُمْ فَاعْمَلُوا، وَ إِذَا تَیَقَّنْتُمْ فَأَقْدِمُوا.»
অর্থাৎ, “তোমাদের জ্ঞানকে অজ্ঞতায় এবং তোমাদের দৃঢ় বিশ্বাসকে সংশয়ে পরিণত করো না। যখন জানতে পারবে, তখন আমল করবে; আর যখন নিশ্চিত হবে, তখন এগিয়ে যাবে।”
তিনি বলেন, হযরত আলী (আ.) নিজেই এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা করেছেন-«إذا علمتم فاعملوا»; অর্থাৎ কোনো বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করলে এবং সত্য তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেলে তার ওপর আমল করো।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, মানুষকে আমলের মাধ্যমে নিজের জ্ঞানকে জীবন্ত রাখতে হবে। কারণ আমলহীন আলেম নিজের জ্ঞানকে অজ্ঞতায় পরিণত করেছেন। কোনো কিছু জানা যদি জীবনে কোনো প্রভাব না ফেলে, তাহলে তা না জানারই সমতুল্য। মানুষের জ্ঞান আছে, কিন্তু সেই জ্ঞান তার জন্য কোনো বরকত বয়ে আনছে না; বরং সে জ্ঞানকে অজ্ঞতায় পরিণত করেছে।
মানুষের জ্ঞান ও বক্তব্য তার জ্ঞানী ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে
এরপর তিনি মানুষের জীবনে জ্ঞানের প্রভাবের কথা উল্লেখ করে বলেন, মানুষের কাছ থেকে যা কিছু প্রকাশ পায়, তা তার জ্ঞান ও ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক। সে যে বই লেখে, যে চিঠি লেখে, যে কথা বলে এবং যে বক্তৃতা দেয়-সবই তার জ্ঞানের প্রতিনিধিত্ব করে।
তিনি বলেন, হাওযার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। হাওযা থেকে যা শোনা, দেখা, বলা ও লেখা হয়-শিক্ষাদান, গ্রন্থ রচনা কিংবা বক্তব্য-সবই হাওযার বিশ্বাস ও জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার প্রতিনিধিত্ব করে। তাই সতর্ক থাকতে হবে, যেন যেকোনো কথা বলা বা যেকোনো বিষয় লেখা না হয়। কথা বলার সময়, কলম ধরার সময় এবং সামাজিক আচরণের ক্ষেত্রেও মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে। মানুষ যে কথাই বলে, তা তার পক্ষ থেকে একটি বার্তা বহন করে; তাই সেই কথা পরিণত, ভারসাম্যপূর্ণ ও চিন্তাপ্রসূত হওয়া উচিত।
সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাওহীদী দৃষ্টিভঙ্গি
হযরত আয়াতুল্লাহ জাওয়াদি আমোলি বলেন, কোনো ব্যক্তির জ্ঞানগত প্রয়োজন থাকতে পারে এবং কোনো বৈজ্ঞানিক সমস্যা সমাধানের জন্য সে আপনার কাছে আসতে পারে। আবার কেউ কোনো সামাজিক সমস্যায় পড়ে আপনার কাছে সাহায্য চাইতে পারে। আপনি যদি তার প্রয়োজন পূরণ করতে সক্ষম হন, তাহলে তাকে ফিরিয়ে দেবেন না। আর যদি সাহায্য করার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে সম্মানজনকভাবে তাকে ফিরিয়ে দিয়ে এমন ব্যক্তির সন্ধান দিন, যিনি তার সমস্যার সমাধান করতে পারবেন।
তিনি বলেন, তাওহীদী দৃষ্টিভঙ্গি সমাজকে জীবন্ত করে তোলে। সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই তাওহীদী দৃষ্টিভঙ্গিই সমাজকে সভ্য করে। মানুষের মনে রাখা উচিত, যে অভাবী ব্যক্তি তার কাছে এসেছে, সে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত প্রতিনিধি হতে পারে। তাই তার সঙ্গে সম্মানের আচরণ করা উচিত।
হযরত আলী (আ.)-এর একটি নূরানি বক্তব্য হলো:
«المسکین رسولالله»
‘অভাবী ব্যক্তি আল্লাহর রাসুলের পক্ষ থেকে প্রেরিত প্রতিনিধি।‘
অর্থাৎ, সে আপনার কাছে এসেছে, যাতে আপনি তার প্রয়োজন পূরণ করেন।
মানুষের রিজিক আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত
বক্তব্যের অন্য অংশে রিজিক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা কোনো বান্দাকে রিজিক ছাড়া সৃষ্টি করেননি। মানুষের রিজিকের কিছু অংশ তার নিজের হাতে রয়েছে এবং কিছু অংশ আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। আর আল্লাহর কাছে যা রয়েছে, তা মানুষের হাতে যা রয়েছে তার চেয়ে অধিক দৃঢ় ও নিশ্চিত।
তিনি পবিত্র কুরআনের এই আয়াতের মর্মের প্রতি ইঙ্গিত করেন:
«مَا عِندَکُمْ یَنفَدُ وَمَا عِندَ اللَّهِ بَاقٍ»
‘তোমাদের কাছে যা আছে তা নিঃশেষ হয়ে যাবে, আর আল্লাহর কাছে যা আছে তা অবশিষ্ট থাকবে।‘
তিনি বলেন, মানুষের হতাশ হওয়া উচিত নয়। আল্লাহর কাছে যে পরিমাণ রিজিক সংরক্ষিত রয়েছে, তা নিরাপদ রয়েছে এবং মহান আল্লাহ তা বন্ধ করবেন না। কিছুটা ধৈর্য ধরতে হবে। এটিও তাওহীদভিত্তিক জীবনের একটি প্রকাশ।
জুলুমের কাছে নতি স্বীকার করবেন না
হযরত আয়াতুল্লাহ জাওয়াদি আমোলি তাঁর বক্তব্যের অন্য অংশে সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা এবং জুলুমের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বলেন, আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.) বলেছেন:
«لَا یَمْنَعُ الضَّیْمَ الذَّلِیلُ»
‘অপমানিত ও নীচ ব্যক্তি ছাড়া কেউ জুলুম সহ্য করে না।‘
তিনি বলেন, সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করুন এবং জুলুমের কাছে নতি স্বীকার করবেন না।
তিনি আরও বলেন, আরেকটি নূরানি বক্তব্যে এসেছে:
«رُدُّوا الْحَجَرَ مِنْ حَیْثُ جَاءَ»
‘যেখান থেকে পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছে, সেখানেই তা ফিরিয়ে দাও।‘
অর্থাৎ, কারও ওপর প্রথমে পাথর নিক্ষেপ বা জুলুম করা যাবে না; কিন্তু কেউ যদি আপনার ওপর পাথর নিক্ষেপ করে, তাহলে তা সঙ্গে সঙ্গে ফিরিয়ে দিতে হবে।
সমাজের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, পুরুষোচিতভাবে জীবনযাপন করুন। পুরুষোচিতভাবে জীবনযাপন করার অর্থ হলো শিল্পসম্মত, বিচক্ষণ ও সাহসিকতার সঙ্গে জীবনযাপন করা। এটিই আমিরুল মুমিনিন (আ.)-এর দৈনন্দিন জীবনের মর্যাদা ও সম্মানের শিক্ষা। তিনি শুধু রাতের বেলায় দোয়া ও কান্নার মানুষ ছিলেন না; বরং সামাজিক জীবনেও সম্মান, মর্যাদা ও মাথা উঁচু করে থাকার বিষয়টি অনুসরণ করেছেন।
জনগণের প্রতিরোধ ও দৃঢ়তার প্রশংসা
সমাজের বর্তমান পরিস্থিতির প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, আজ এই প্রতিরোধ ও দৃঢ়তা আমাদের বোন, মা, সন্তান ও ভাইদের হাতে পতাকার মতো ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, যোদ্ধারাও ময়দানে উপস্থিত রয়েছেন এবং অস্ত্র হাতে প্রস্তুত রয়েছেন। এগুলো একটি জাতির গৌরব, মহত্ত্ব ও ঐক্যের প্রকাশ।
হযরত মারইয়াম (সা.)-সমগ্র মুমিন সমাজের আদর্শ
বক্তব্যের শেষাংশে হযরত আয়াতুল্লাহ জাওয়াদি আমোলি কুরআন মাজিদে ‘নারী’, ‘পুরুষ’ ও ‘মানুষ’ শব্দের ব্যবহারের পার্থক্যের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, কুরআনে তিন ধরনের সম্বোধন দেখা যায়।
কখনো কেবল নারীদের সম্পর্কে আলোচনা করা হলে «نساء» এবং নারীদের সঙ্গে সম্পর্কিত শব্দ ব্যবহার করা হয়। আবার কখনো পুরুষদের সম্পর্কে আলোচনা হলে «رجال» শব্দ ব্যবহৃত হয়। আর যখন সমগ্র সমাজ তথা নারী ও পুরুষ উভয়কে বোঝানো হয়, তখন «ناس», অর্থাৎ মানুষ বা সাধারণ জনগণ-এ ধরনের ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ ব্যবহার করা হয়।
তিনি হযরত মারইয়াম (সা.আ.)-এর উদাহরণ দিয়ে বলেন, পবিত্র কুরআন হযরত মারইয়াম (সা. আ.)-এর পরিচয় দিতে বলেছে:
«ضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِلَّذِینَ آمَنُوا مَرْیَمَ»
‘আল্লাহ মুমিনদের জন্য মারইয়ামকে দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।‘
অর্থাৎ তাঁকে শুধু নারীদের জন্য আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। তাই হযরত মারইয়াম (সা. আ.) ভালো ও মুমিন মানুষের এবং একটি ঈমানদার সমাজের আদর্শ। আজও ভালো মানুষের দৃষ্টান্ত হলেন আমাদের সেই বোন ও নারীরা, যারা হাতে পতাকা ধারণ করে রয়েছেন।
বক্তব্যের শেষে হযরত আয়াতুল্লাহ জাওয়াদি আমোলি অতীতপ্রয়াত ব্যক্তি, শহীদ এবং উপস্থিত সবার জন্য দোয়া করে বলেন: আমরা মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের অতীতপ্রয়াত ব্যক্তি ও শহীদদের তাঁর ওলিদের সঙ্গে পুনরুত্থিত করেন এবং আপনাদের প্রত্যেককে সম্মান, মর্যাদা ও মহত্ত্ব দান করেন এবং আপনাদের দুনিয়া ও আখিরাতকে কল্যাণময় করে দেন।
আপনার কমেন্ট